ট্রয় যুদ্ধের কাহিনি নিশ্চয় শুনেছেন? হোমারের ‘ওডিসি’ এবং ভার্জিলের ‘ইনিড’ মহাকাব্যের উপজীব্য গ্রিক বাহিনী ও ট্রয় নগরের মধ্যকার দীর্ঘ যুদ্ধ। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে যুদ্ধ করেও কোনোভাবেই ট্রয় নগরী জয় করতে পারছিল না গ্রিক সৈন্যরা। পরবর্তীকালে একটি কৌশলের আশ্রয় নেয়। একটি বিরাট কাঠের ঘোড়া তৈরি করে ট্রয় নগরীর সামনে ফেলে রেখে যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করে। ফলে ট্রয়বাসী ধরে নেয় গ্রিকরা হার মেনে নিয়েছে এবং দেবতার তুষ্টির জন্য এই বিশাল এক কাঠের ঘোড়া রেখে গিয়েছে। অথচ ওই ঘোড়ার ভিতরেই লুকিয়ে ছিল কিছু গ্রিক সৈন্য। ট্রয়বাসী যখন ঘোড়াটি শহরের ভেতরে নিয়ে যায় ও যুদ্ধ জয়ের উল্লাসে মেতে উঠে তখনই গ্রিক সৈন্যরা সেখান থেকে বের হয়ে আক্রমণ চালায়। আর এভাবেই, ট্রয় নগরী জয় করে গ্রিকরা।
গ্রিক পুরাণের এই কৌশল কাজে লাগিয়ে ম্যালওয়্যার জগতে আবির্ভাব হয়েছে ট্রোজেন হর্স নামক ভাইরাসের। সুপরিচিত কোনোকিছুর ফাইল হিসেবে এই ম্যালওয়্যার আপনার কাছে আসবে এবং আপনার ডিভাইসের সর্বনাশ ডেকে আনবে। এটি এমন ম্যালওয়্যার যা ডাউনলোডের পর ডিভাইস সিস্টেম দখল করে নেয়। পাশাপাশি আপনার ডেটা চুরি, অন্যান্য ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার নিজে নিজে ইন্সটল করে সিস্টেম দুর্বল ও অনলাইন নজরদারিসহ অন্যান্য সাইবার আক্রমণের পথ করে দেয়।
ইমেইলের সাথে পাঠানো কোনো অ্যাটাচমেন্ট বা ইনভয়েস, কোনো আকর্ষণীয় ভিডিও কিংবা কোনো অযাচিত লিংক বা ওয়েবসাইট থেকে নামানো সফটওয়্যার- যেকোনো পদ্ধতিতে ডিভাইসে যেকোনো ধরনের ম্যালওয়্যার প্রবেশ করতে পারে। ট্রোজেন হর্স ভাইরাসও এভাবে কাজ করে। সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা ফিশিং লিংকের মাধ্যমে সাইবার আক্রমণকারীরা ফাঁদ তৈরি করে যেন লক্ষ্যবস্তুর সিস্টেম আয়ত্তে নিতে পারে। তবে, এটি নিজে নিজে ইন্সটল হতে পারে না, কার্যকর হওয়ার জন্য ব্যবহারকারীকেই এই ফাইলটি ডাউনলোড করতে হয়। এরপর, যতবার সংক্রামিত ডিভাইসটি চালু হবে, ট্রোজান হর্স প্রতিবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলবে। আবার, কোনো একটি নির্দিষ্ট সিস্টেম নেটওয়ার্কের একটি কম্পিউটার সংক্রমিত হলে নেটওয়ার্কে সংযুক্ত অন্য ডিভাইসগুলোও সংক্রমিত হতে পারে এই ভাইরাস দ্বারা।
প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নয়নের ফলে ম্যালওয়্যারগুলোর মধ্যেও অনেক আধুনিক ফাংশন এসেছে যা এগুলোকে আরও বেশি ক্ষতিকর করে তুলে। ট্রোজেন ভাইরাসের মধ্যেও এরূপ কয়েক ধরন রয়েছে। তার মধ্যে নিচে কয়েকটি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
১। ব্যাকডোর ট্রোজেন: এটি আপনার ডিভাইসে গোপনে প্রবেশ করার পথ তৈরি করে দেয় যার মাধ্যমে আক্রমণকারীরা সহজেই আপনার ডিভাইসের অ্যাক্সেস পায় এবং আপনার তথ্য চুরি ও চাইলে অন্যান্য ক্ষতিকর ভাইরাসও ইনস্টল করতে পারে।
২। ব্যাংকিং ট্রোজেন: এর মূল উদ্দেশ্য ব্যক্তির ব্যাংকিং ডেটা ও ক্রেডিট কার্ডের ডিটেইলস সংগ্রহ করা। কোনো ফিশিং লিংক বা ইমেইলের মাধ্যমে ব্যাংকিং ওয়েবসাইটের মতো নকল ওয়েবসাইটে নিয়ে ব্যবহারকারীর লগইন ক্রেডেনশিয়াল ডেটা চুরি করে নেয়।
৩। ডিডোস ট্রোজান: এটি আপনার ডিভাইসকে একটি বড় নেটওয়ার্কের বা বটনেটের সাথে যুক্ত করে দেয় এবং আপনার অজান্তে আপনার ডিভাইস ব্যবহার করে অন্য কোনো সার্ভারে নানা ধরনের অ্যাটাক করা হয়।
৪। ডাউনলোডার ট্রোজান: এটি আপনার কম্পিউটারে ঢোকার পর ইন্টারনেটের মাধ্যমে গোপনে আরও মারাত্মক সব ভাইরাস (যেমন: র্যানসামওয়্যার বা স্পাইওয়্যার) ডাউনলোড এবং ইনস্টল করে।
৫। ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং ট্রোজান: এটি মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা এ ধরনের অ্যাপগুলোকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়। এদের কাজ হলো আপনার লগ-ইন আইডি এবং পাসওয়ার্ড চুরি করা।
একটি ট্রোজেন ভাইরাসের প্রভাব অনেক সময় ভয়াবহও হতে পারে। ব্যক্তির তথ্য চুরি, পরিচয়পত্র এবং লগইন ক্রেডেনশিয়াল ব্যবহার করে আইডেন্টিটি থেফট বা পরিচয় চুরির মতো অপরাধ ঘটতে পারে। আক্রমণকারীরা ব্যবহারকারীর পরিচয় নিয়ে তার নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, টাকা-পয়সা লেনদেন, লোন নেওয়া থেকে শুরু করে যেকোনো কিছু করতে পারে। লক্ষ্যবস্তু কোনো প্রতিষ্ঠান হলে তাদের কর্মচারী ও গ্রাহকের তথ্য চুরি, তাদের দীর্ঘমেয়াদী সম্মান ও ভরসা ভাঙার মতো ক্ষতি করে, যার ফলে তাদের ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়। এছাড়াও, অনেক ট্রোজেন বিভিন্ন রানসমওয়্যার ছড়িয়ে সিস্টেম দখল করে মুক্তিপণ দাবি করতে পারে। ফলে এর থেকে কীভাবে বেঁচে থাকা যায় তা জানা প্রয়োজন।
ট্রোজেন ভাইরাস বা অন্য কোনো ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার অথবা অনলাইনের যেকোনো হুমকি থেকে বাঁচতে প্রথমেই প্রয়োজন ডিজিটাল হাইজিন মেনে চলা। আপনার ব্যবহারকৃত সব ডিভাইস প্রতিনিয়ত সুরক্ষিত রাখতে ও ডিজিটাল জগতে নিরাপদ ব্রাউজিং করতে আপনার প্রয়োজন সেগুলো আপডেটেড রাখা, একটি ভালো মানের অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করা ও নিয়মিত সেগুলো স্ক্যান করা। এছাড়াও, অপরিচিত কোনো মেইল বা টেক্সট থেকে আশা অযাচিত লিংক কৌতুহলবসত ক্লিক করার আগে চেক করুন লিংকটি সঠিক কিনা। এতে যেকোনো ফিশিং আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন। ইন্টারনেট ব্রাউজের ক্ষেত্রে ইউআরএলটি সঠিক কিনা যাচাই করুন। এছাড়াও, আপনার ব্রাউজারের অফিসিয়াল স্টোর থেকে নির্ভরযোগ্য কোনো সিকিউরিটি বা প্রাইভেসি এক্সটেনশন ব্যবহার করতে পারেন।
প্রতিনিয়ত অনলাইন ঝুঁকির সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে। ফলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিরাপদ ব্রাউজিং করতে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। ডিজিটাল হাইজিনের নিয়মগুলো যেমন, সবসময় শক্তিশালী এবং আলাদা আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা, টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন অন রাখা ও যেকোনো অপরিচিত লিংকে ক্লিক বা ফাইল ডাউনলোড করার আগে অথেনটিক সোর্স সবসময় চেক করা- মেনে চলা উচিত। কারণ ট্রোজান যেকোনো রূপেই আপনার সামনে আসতে পারে!